হাফিজুল ইসলাম লস্কর
একটি জাতির দর্পণ হলো তার সাহিত্য। অথচ স্বাধীনতার ৫৪ বছর পার করেও বাংলাদেশে সৃজনশীল মানুষদের রাষ্ট্রীয় মর্যাদা ও অধিকার রক্ষার জন্য কোনো স্বতন্ত্র প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে ওঠেনি। বর্তমানে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের একটি শাখা হিসেবে সাহিত্যের যাবতীয় কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। কিন্তু সাহিত্যের যে বিশালতা এবং এর যে সুনির্দিষ্ট দাবি, তা কেবল একটি মন্ত্রণালয়ের শাখা হিসেবে পূরণ করা অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের কবি ও সাহিত্যিকদের ‘সাহিত্য মন্ত্রণালয়’ গঠনের আহ্বান কেবল একটি দাবি নয়, বরং এটি সৃজনশীল সমাজের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই।
কেন প্রয়োজন আলাদা মন্ত্রণালয়?
বর্তমানে বাংলা একাডেমি এবং জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র সাহিত্যের প্রধান অভিভাবক হিসেবে কাজ করলেও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও বাজেটের সীমাবদ্ধতায় তারা অনেক ক্ষেত্রেই কাঙ্ক্ষিত ভূমিকা রাখতে পারছে না। একটি স্বতন্ত্র মন্ত্রণালয় কেন প্রয়োজন, তার কয়েকটি যৌক্তিক কারণ নিচে দেওয়া হলো:
- বিশ্বদুয়ারে বাংলা সাহিত্য: বাংলা সাহিত্যকে বিশ্বদরবারে পৌঁছে দিতে প্রাতিষ্ঠানিক ও মানসম্মত অনুবাদের বিকল্প নেই। ব্যক্তিগত উদ্যোগে কিছু কাজ হলেও রাষ্ট্রীয়ভাবে বড় পরিসরে ইংরেজি ও অন্যান্য ভাষায় অনুবাদের কোনো শক্তিশালী কাঠামো নেই। একটি স্বতন্ত্র মন্ত্রণালয় থাকলে এই কার্যক্রম গতিশীল হবে।
- তৃণমূলের মেধা অন্বেষণ: জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে ছড়িয়ে থাকা অগণিত কবি ও সাহিত্যিকদের কোনো সঠিক তালিকা রাষ্ট্রযন্ত্রের কাছে নেই। স্বতন্ত্র মন্ত্রণালয় থাকলে এই প্রান্তিক মেধাবীদের তালিকাভুক্ত করে তাদের সৃষ্টিকে জাতীয় পর্যায়ে তুলে আনা সহজ হবে।
- সৃজনশীলদের রাষ্ট্রীয় সুরক্ষা: দেশের অগণিত কবি-সাহিত্যিক আজও অবহেলিত। তাদের স্বাস্থ্যসেবা, আবাসন এবং বার্ধক্যকালীন নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে একটি নির্দিষ্ট প্রশাসনিক ছায়া প্রয়োজন।
স্বায়ত্তশাসন বনাম নতুন কাঠামো
অনেকেই মনে করেন, বর্তমান প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বায়ত্তশাসন এবং বাজেট বাড়ালেই সমস্যার সমাধান সম্ভব। কিন্তু বাস্তবতা হলো, একটি সুনির্দিষ্ট মন্ত্রণালয়ের অধীনে না থাকলে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে সাহিত্যের কণ্ঠস্বর জোরালো হয় না। 'সাহিত্য মন্ত্রণালয়' গঠিত হলে দেশের মননশীল সমাজ একটি সুসংগঠিত রূপ পাবে, যা দীর্ঘমেয়াদে আমাদের জাতীয় চেতনার বিকাশ ঘটাবে।
জাতির মননশীলতাকে বিকশিত করতে এবং সৃজনশীল মানুষদের যথাযথ মর্যাদা দিতে এখন সময় এসেছে 'সাহিত্য মন্ত্রণালয়' নিয়ে গুরুত্ব সহকারে ভাবার। আমরা বিশ্বাস করি, সরকার এই যৌক্তিক দাবিটি বিবেচনা করবে এবং বাংলাদেশের সাহিত্যকে বিশ্ব দরবারে মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করবে।

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন