মানবসভ্যতার শ্রেষ্ঠ সম্পদ হলো জ্ঞান, আর সেই জ্ঞানের প্রধান বাহন হলো বই। আদিম গুহাচিত্র থেকে আধুনিক ডিজিটাল লাইব্রেরি, সভ্যতার এই দীর্ঘ পথচলায় বই ছিল মানুষের বিশ্বস্ত সারথি। পবিত্র কুরআনের প্রথম বাণীই ছিল "ইকরা" বা "পড়ো"। এই ঐশী নির্দেশনাই প্রমাণ করে যে, মানবজীবনে শ্রেষ্ঠত্বের সূচনা ঘটে বই পাঠের মধ্য দিয়ে। বই কেবল তথ্যের ভাণ্ডার নয়, এটি মানুষের মনের অন্ধকার দূর করার এক অবিনশ্বর প্রদীপ।
বইয়ের প্রতিটি পাতা যেন একেকটি বিদ্যালয়, যা আমাদের সীমানা ছাড়িয়ে অজানাকে জানার সুযোগ করে দেয়। ফরাসি দার্শনিক রনে দেকার্ত বলেছিলেন, "সব ভালো বই পড়া মানে গত শতাব্দীর সেরা মানুষের সাথে কথা বলা।
ইতিহাসের বই: আমাদের অতীতের ভুল ও সাফল্য থেকে শিক্ষা দেয়।
সাহিত্য ও কাব্য: মানুষের হৃদয়ে সহানুভূতি ও কোমলতা জাগিয়ে তোলে।
বিজ্ঞান ও দর্শন: আমাদের চিন্তাকে করে যুক্তিবান ও শাণিত।
যে মানুষ বই পড়ে না, সে যেন এক প্রাচীরঘেরা প্রকোষ্ঠে বাস করে; যার পৃথিবীটা কেবল নিজের অভিজ্ঞতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ।
বিশ্বের শ্রেষ্ঠ চিন্তাবিদগণ বইকে দেখেছেন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতে, বই মানুষের চিন্তার জগৎকে অসীম পর্যন্ত প্রসারিত করে।
কাজী নজরুল ইসলাম বইকে দেখেছেন সুপ্ত চেতনা জাগানোর অগ্নিস্ফুলিঙ্গ হিসেবে।
ফ্রান্সিস বেকন যথার্থই বলেছেন, "Reading maketh a full man" (পাঠ মানুষকে এক পূর্ণাঙ্গ মানুষে রূপান্তরিত করে)।
ডঃ সিউস বা Theodor Seuss Geisel বলেন, “The more that you read, the more things you will know”(কথাটির অর্থ হলো—"আপনি যত বেশি পড়বেন, তত বেশি নতুন বিষয় জানতে বা শিখতে পারবেন)।
অর্থাৎ, প্রকৃত শিক্ষা কেবল পাঠ্যবইয়ের গণ্ডিতে নয়, বরং বিচিত্র বিষয়ের পাঠের মাধ্যমেই অর্জিত হয়।
বর্তমান প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে শিক্ষার্থীদের কাছে বই অনেক সময় কেবল পরীক্ষার বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু বই হওয়া উচিত পরম বন্ধু। পাঠ্যবই আমাদের পরীক্ষার জন্য তৈরি করে, আর বহির্পাঠ আমাদের জীবনের মহাযুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করে। প্রতিদিন অল্প সময় হলেও আনন্দের জন্য বই পড়ার অভ্যাস করলে মনের প্রসার ঘটে, ভাষাজ্ঞান বৃদ্ধি পায় এবং সৃজনশীলতা বিকশিত হয়।
একটি সমৃদ্ধ ও উন্নত সমাজ গঠনের প্রধান শর্ত হলো মুক্তচিন্তা ও কুসংস্কারমুক্ত মন। বই মানুষকে সংকীর্ণতা ও অন্ধ বিশ্বাস থেকে মুক্ত করে সত্য অনুসন্ধানে সাহসী করে তোলে। যে সমাজে পাঠাগার ও বইয়ের কদর বেশি, সেই সমাজে অপরাধ ও অস্থিরতা কম। বই পড়া কেবল অবসর বিনোদন নয়, এটি মননের এক নীরব বিপ্লব যা ধীরস্থিরে সমাজকে বদলে দেয়।
বই পড়ার অভ্যাস কোনো জন্মগত বিষয় নয়, এটি পরিবেশের মাধ্যমে গড়ে ওঠে। এক্ষেত্রে বড়দের ভূমিকা অনস্বীকার্য:
শিক্ষক: শিক্ষার্থীদের মুখস্থবিদ্যার শিকল থেকে বের করে জ্ঞানপিপাসু করে তুলবেন।
অভিভাবক: সন্তানের হাতে খেলনা বা স্মার্টফোনের আগে রঙিন বই তুলে দেবেন।
দৃষ্টান্ত: বড়রা যখন নিজেরা বই পড়বেন, ছোটরা স্বাভাবিকভাবেই সেই অভ্যাসে অনুপ্রাণিত হবে।
পরিশেষে বলা যায়, বই পাঠ কেবল একটি শখ নয়, এটি আত্মার খোরাক। একটি আলোকিত জাতি এবং মানবিক বিশ্ব গড়ে তোলার জন্য বইয়ের কোনো বিকল্প নেই। বই মানুষকে অন্ধকার থেকে আলোয় এবং অজ্ঞতা থেকে প্রজ্ঞার পথে নিয়ে যায়। তাই আসুন, আমরা যান্ত্রিকতার ভিড়ে বইকে হারিয়ে যেতে না দিয়ে বরং বইকে জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ করে তুলে নিজেকে এবং সমাজকে আলোকিত করি।
লেখক-
হাফিজুল ইসলাম লস্কর
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ সময়ের আলাপ।
সাবেক শিক্ষকঃ -জামেয়া দারুল উলূম, রায়নগর, সিলেট।
সিলেট ব্যুরো প্রধানঃ আজকের জনকথা।

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন