শুক্রবার, ৩০ জানুয়ারি, ২০২৬

শবে বরাত: আত্মশুদ্ধি ও প্রত্যাবর্তনের মহিমান্বিত রজনী


                        بسم الله الرحمن الرحيم

ইসলামি ঐতিহ্যে শবে বরাত বা 'লাইলাতুল বারাআত' এক মহিমান্বিত রজনী। ফারসি শব্দ 'শব' অর্থ রাত আর 'বরাআত' অর্থ মুক্তি। অর্থাৎ এটি মুক্তির রজনী। এই রাত কেবল প্রথাগত ইবাদতের সময় নয়, বরং এটি স্রষ্টার সাথে সৃষ্টির গভীর সংযোগ স্থাপন এবং নিজের ভেতরকার অন্ধকার দূর করে আলোর পথে ফেরার এক অনন্য সুযোগ।

​মানুষ হিসেবে আমরা ভুল ও পাপে নিমজ্জিত হই। শবে বরাত আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, পাপের পাল্লা যত ভারীই হোক না কেন, আল্লাহর রহমতের দরজা কখনোই বন্ধ হয় না। এটি নিরাশার বিপরীতে আশার এক অভয়বাণী। হাদিসের বর্ণনা অনুযায়ী, এই রাতে মহান আল্লাহ তাঁর সৃষ্টির প্রতি বিশেষ রহমতের দৃষ্টি দেন এবং অগণিত মানুষকে ক্ষমা করেন। এই রাত আমাদের শেখায় যে, আন্তরিক 'তাওবা' বা অনুশোচনা করলে আল্লাহ যেকোনো গুনাহ মাফ করতে ভালোবাসেন।

​শবে বরাত কেবল সারারাত জেগে ইবাদত করার নাম নয়, বরং এটি নিজের অন্তরের ময়লা পরিষ্কার করার রাত। প্রকৃত ইবাদতের পথে প্রধান বাধা হলো মানুষের ভেতরের হিংসা, অহংকার এবং মানুষের সাথে সম্পর্কের তিক্ততা। ইসলামি বিধান মতে, যারা অন্যের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করে বা আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করে, তাদের জন্য এই রহমতের রাতেও ক্ষমা প্রাপ্তি কঠিন হয়ে পড়ে। তাই এই রাত আমাদের শেখায়, ​প্রতিশোধ নয়, বরং ক্ষমার মহানুভবতা ধারণ করা। ​অহংকার বিসর্জন দিয়ে বিনয়ী হওয়া।
​মানুষের মনে কষ্ট দিয়ে থাকলে তা মিটিয়ে নেওয়া।

শবে বরাতের ফযীলত সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য কয়েকটি হাদীস-:""

১ম হাদীস

عن معاذِ بنِ جبلٍ ٬ عنِ النَّبيِّ صلّى اللَّهُ عليهِ وسلَّمَ ٬ قالَ : يطَّلِعُ اللهُ إلى خَلقِه في ليلةِ النِّصفِ مِن شعبانَ فيغفِرُ لجميعِ خَلْقِه إلّا لِمُشركٍ أو مُشاحِنٍ

অর্থ : হযরত মু'আজ ইবনে জাবাল রাদি. থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, আল্লাহ তা'আলা অর্ধ শা'বানের রাতে [শবে বরাতে] তাঁর সৃষ্টির প্রতি মনযোগী হন এবং মুশরিক ও বিদ্বেষ পোষণকারী ব্যক্তি ছাড়া সবাইকে ক্ষমা করে দেন।
সূত্র: সহীহ ইবনে হিব্বান, হাদীস : ৫৬৬৫; সুনানে ইবনে মাজাহ্, হা: ১৩৯০; মুসান্নাফু ইবনে আবী শাইবাহ, হা: ৩০৪৭৯; ওয়াবুল ঈমান, হা: ৬২০৪

২য় হাদীস

عن عليِّ بنِ أبي طالبٍ رضي اللَّهُ عنهُ قالَ: قالَ رسولُ اللهِ صلّى اللهُ عليه وسلَّمَ إذا كانت ليلةُ النِّصفِ من شعبانَ فقوموا ليلَها، وصوموا نَهارَها، فإنَّ اللَّهَ يَنزِلُ فيها لغُروبِ الشَّمسِ إلى سماءِ الدُّنيا، فيقولُ: ألا من مُستغفِرٍ لي فأغفرَ لَه ! ألا مُسترزِقٌ فأرزقَهُ ألا مُبتلًى فأعافيَهُ ألا كذا ألا كذا حتّى يطلُعَ الفجرُ

অর্থ : হযরত আলী রাযি. থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, অর্ধ শা'বানের রাত [১৪ শা'বান দিবাগত রাত] যখন আসে তখন তোমরা এ রাতটি ইবাদত বন্দেগীতে কাটাও এবং দিনের বেলায় রোযা রাখ। নিশ্চয় আল্লাহ তা'আলা এ রাতে সূর্যাস্তের পর প্রথম আসমানে আসেন এবং বলতে থাকেন, আছে কি কোনো ক্ষমাপ্রার্থী? আমি তাকে ক্ষমা করবো। আছে কি কোনো রিযিক প্রার্থী, আমি তাকে রিযিক দিব। আছে কি কোনো বিপদগ্রস্ত, আমি তাকে বিপদমুক্ত করে দিবো। আছে কি এমন আছে কি এমন, এভাবে সুবহে সাদিক পর্যন্ত বলতে থাকেন।
-সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস : ২৩৮৪; শুয়াবুল ঈমান, হা: ৩৮২২; আত্তারগীব ওয়াত্ তারহীব : ২/১৩৩

৩য় হাদীস

হযরত আ'লা ইবনুল হারিস্ রহ. থেকে বর্ণিত, উম্মুল মু'মিনীন হযরত আয়েশা রাদি. বলেন, একবার রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রাতে নামাযে দাঁড়ালেন এবং এত দীর্ঘ সিজদা করলেন যে, আমার আশঙ্কা হলো তাঁর হয়তো ইন্তেকাল হয়ে গেছে।
আমি তখন উঠে তাঁর বৃদ্ধাঙ্গুলি নাড়া দিলাম। তাঁর বৃদ্ধাঙ্গুলি নড়ল। যখন তিনি সিজদা থেকে উঠলেন এবং নামায শেষ করে বললেন, হে আয়েশা! অথবা বললেন, ওহে হুমায়রা! তোমার কি এই আশঙ্কা হয়েছে যে, আল্লাহর রসূল সা. তোমার হক নষ্ট করবেন? আমি উত্তরে বললাম, না, ইয়া রাসূলুল্লাহ! আপনার দীর্ঘ সিজদা থেকে আমার আশঙ্কা হয়েছিল আপনি ইন্তেকাল করেছেন কি না। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জিজ্ঞাসা করলেন, তুমি কি জান এটা কোন্ রাত? আমি বললাম, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলই ভালো জানেন। তিনি তখন বললেন,

هذهِ ليلةُ النِّصفِ من شَعبانَ، إنَّ اللهَّ عزَّ وجلَّ يَطَّلعُ على عِبادِه في ليلَةِ النِّصفِ مِن شَعبانَ، فيغفرُ للمستَغفرينَ، ويرحمُ المستَرحمينَ، ويُؤَخِّرُ أهلَ الحِقدِ كما هُمْ

“এটা হল অর্ধ শা'বাননের রাত। (শা'বাননের ১৪ তারিখ দিবাগত রাত)। আল্লাহ তা'আলা অর্ধ শা'বাননের রাতে তাঁর বান্দাদের প্রতি মনোযোগ দেন, ক্ষমা প্রার্থনাকারীদের ক্ষমা করেন এবং অনুগ্রহপ্রার্থীদের প্রতি অনুগ্রহ করেন। আর বিদ্বেষ পোষণকারীদের ছেড়ে দেন তাদের অবস্থাতেই।” শুআবুল ঈমান, বায়হাকী ৩/৩৮২-৩৮৩

​এই রাতটি প্রতিটি মুমিনের জন্য একটি আয়নার মতো, যেখানে দাঁড়িয়ে নিজেকে প্রশ্ন করতে হয়। শুধু তসবিহ পাঠ বা তিলাওয়াত নয়, বরং নিজের বিবেকের কাছে জবাবদিহি করা প্রয়োজন। ​আমি কি জেনে বুঝে কারো হক নষ্ট করেছি? ​আমি কি স্রষ্টার দেওয়া জীবন বিধান অনুযায়ী চলছি?
​আমার পরিবর্তন কি কেবল এক রাতের জন্য, নাকি চিরস্থায়ী?

​শবে বরাতকে অনেকেই 'ভাগ্য রজনী' হিসেবে অভিহিত করেন। তবে এই রাতের মূল শিক্ষা হলো- ভাগ্য কেবল লিখিত কোনো পাথর নয় যা বদলানো যায় না। বরং বিনম্র প্রার্থনা বা দোয়ার মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালা মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন করে দিতে পারেন। যখন একজন বান্দা অনুশোচনায় চোখ ভেজায় এবং আল্লাহর সামনে নিজের হৃদয় ভেঙে পেশ করে, তখন অসম্ভবও সম্ভব হয়ে ওঠে।

​উপসংহার
পরিশেষে বলা যায়, শবে বরাতের মূল আহ্বান হলো-“ফিরে আসা”। অন্ধকার থেকে আলোতে, অন্যায় থেকে ন্যায়ে এবং বিচ্যুতি থেকে স্রষ্টার আনুগত্যে ফিরে আসাই এই রাতের সার্থকতা। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, যতক্ষণ নিঃশ্বাস আছে, ততক্ষণ প্রভুর রহমত আমাদের ঘিরে আছে। শবে বরাত আমাদের জীবনে আসুক আত্মিক পরিশুদ্ধি এবং সুন্দর আগামীর অঙ্গীকার নিয়ে।



লেখকঃ- হাফিজুল ইসলাম লস্কর
সাবেক শিক্ষকঃ- জামেয়া দারুল উলূম সিলেট
স্বাস্থ্য ও জনসংখ্যা বিষয়ক সম্পাদকঃ- বাংলাদেশ মফস্বল সাংবাদিক ফোরাম।
সাধারণ সম্পাদকঃ- বাংলাদেশ অনলাইন রিপোর্টার্স ক্লাব, সিলেট।
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ- সময়ের আলাপ।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন